রবিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

মৃত প্রহরের যন্ত্রণা মেপে চলা কিংবা ছুঁয়ে দেখা ভ্রমান্ধ দৃশ্যের বায়স্কোপ

সম্পূর্ণ তরতাজা একটা শহরকে মৃত মনে হচ্ছে ইদানীং। রগরগে বিক্ষিপ্ততায় বিকেল ভেসে যাচ্ছে যখন – শূন্য-অসাড়-হাহাকারময় আমিত্ব নিয়ে ‘আমি’গুলো সব ছিন্নভিন্ন, ঝাঝরাও।

তবু ভুল হাসি পরে পরে হেঁটেছি নাগরিক পথে। ভাগ্যিস কেউ চোখে চোখ রাখেনি। আর্তচিৎকার থমকে দাঁড়ায় কোলাহলের ভয়ে, এ শুধু ঘরে ফেরার পরাজিত পদক্ষেপ জানে। অস্তিত্বের আনাচে-কানাচে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় এক। আমি তবু ফিরে ফিরে ধ্বংসকালীন বোবা গল্প পড়ি –
“গদ্যের মধ্যে কবিতার পঙক্তি ভরে দিয়ে বসে থাকি। কবে আর আসে এমন ভাষা, এমন নিবিড় প্রেমে! ভালোবাসা ততক্ষন ভালোবাসাই নয় যদি না তার জন্যে হাহাকার উঠে তোমার ভেতরের গভীর খাঁজে। যদি না তুমি কাঁদতে বসে যাও তার জন্য।” (ধ্বংসকালীন বোবা গল্প)


কেমন করে বাজাতে জানেন গল্পওয়ালা, গহীনে কোথায় যেন বিঁধলো বটে! জ্বালা-ধরা চোখ তো ভীষণ ক্লান্তও, কোন্ অজুহাতে আর উগরে দেওয়া যায় অভিমানের এক সহস্র ঢল।
রমাপদ-এর ভুবন ভোলানো বাঁশিই কি তবে অনেকখানি নয় রমনীর রাত-জাগা নিশি-লাগা মগ্ন মুহূর্তে?
“আর রমাপদ?...সর্বস্ব হারানো, মার খাওয়া মানুষের মতো বুকের কাছে দু’হাত জড়ো করে পালাচ্ছে, দোহাই, তুই, বাবা রজু আমার, তুই দেখতে চাস না কী আছে লুকানো... এই আমার শেষ রহস্য জন্ম ও জীবনের।” (ব্যতিহার)

ভাবতে ভাবতে পড়তে পড়তে প্রহরের পরতে-পরতে মিশে যায় ভ্রমান্ধ দৃশ্যের বায়স্কোপ
(সুমন সুপান্থ-এর গল্পগ্রন্থ, প্রচ্ছদঃ শিবু কুমার শীল, প্রকাশকঃ ভাষাচিত্র, প্রকাশকালঃ অমর একুশে বইমেলা ২০১২)। যেমন করে বলেছেন গল্প বলে চলা, লিখে চলা মানুষটি নিজের কথা নিজের ভাষায়-
“আমি লিখতে চাই গল্প। আর কবিতা আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়।” (সুমন সুপান্থ)

ঠিক তেমন কথাই ভেসে ভেসে ওঠে তুচ্ছ এ পাঠক-মনে। লিখতে চাওয়া লিখে-রাখা সেসব গল্পেরা-কথারা হামলে পড়ে অস্থির মুহূর্তজুড়ে।
“স্মৃতিশিহরিত মেয়েটা কান্না মুছে দেখলো আকাশে শেষবেলার খেলা। কোথাও কো্নো মেঘ নেই। ভ্রম। তার নিজের মনের সাপলুডু খেলা। পাখিরা তখন ডানায় রং নিয়ে বাড়ি ফিরছে। আর রিপন ছেলেটা তার হাতে গুঁজে দিচ্ছে একটা সবুজাভ পালক। মনে মনে সে রিপনের পালক ধরা হাতে চুমু খেলো। পৃথিবী পৃথিবীকে ঠিক এমনটাই দেখতে চায়। জীবন জীবনকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায় সবখানে। মানুষ একদিন এইসব জানতো। ”(ভ্রমান্ধ দৃশ্যের বায়স্কোপ)

সত্যি আজও যদি জানতো মানুষ কিংবা মানুষেরা প্রত্যেকেই, ভ্রম-বিভ্রম কাটিয়ে উঠার খেলায় তবে কী জিতে যাওয়া যেত প্রতিবার। কী করে জানা যাবে আর! প্রতিটা দগ্ধ অনুভবই কি প্রশ্নবিদ্ধ নয় কিংবা অমীমাংসিতই শেষমেশ?
“সবার গল্প যেমন আলাদা, মীমাংসার ধরণও কি তাই নয় ? মানুষ জন্মের রহস্য বোধ করি এই, প্রত্যেকের জন্মযাতনা আলাদা…”(ভ্রমান্ধ দৃশ্যের বায়স্কোপ)

কখনও কখনও কি ভয়ঙ্কর এক বোধ গলার কাছে কামড় বসায় না? যেন এই সেই বোধ, গল্পওয়ালা আরও একবার দুমড়ে মুচড়ে দিলেন ভেতরকে –
“বড় হওয়া অনেক কষ্টের। বড় হলে কেবল মরে যেতে ইচ্ছে করে। শৈশবে যে জীবনকে ঘুড়ির মতো পলকা মনে হয়, বড় হলে তাকেই বোঝার মতো লাগে। সবার কি এমন হয় ?” (ভ্রমান্ধ দৃশ্যের বায়স্কোপ)
এমন করে কবে আর ভাবতে শেখা হল! ভুলে-ভর্তি শূন্য জীবন যেন আর্তনাদ করে ওঠে।

মাঠ-ঘাট-বন-জঙ্গল পেরিয়ে এক সহজ সরল মায়ের ততোধিক সারল্য-ভরা ছেলেটার রাজনীতির জালে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায়, মৃত্যুময় বিষাদে ভেঙে ভেঙে পড়ে মন।
“গলার ভেতর প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে সে মাকে ডাকতে চাইলো আবার -‘আম্মা, এরা আমারে মারি লাইলো। তুমি আমারে বাঁচাও আম্মা...আ-ম্মা...আমি মরি যাইরাম...’ । এবারও কথাগুলো বেরিয়ে আসতে পারলো না। মাথার পেছন দিকে আরেকটা সীসাখণ্ড ঢুকে মগজের অন্দরে এমন ছোবল মারলো সে দিগ্বিদিকশূন্য, জ্ঞানহীন শেষবারের মতো ছুটে পালাতে চাইলো। কিন্তু ছুটে গিয়ে পড়লো খালের পানিতে। তাতে কোন পরিত্রাণ নয়, তার তৃষ্ণাই বেড়ে গেল কেবল। কুকুরের মতো চুকচুক করে পানি খেতে চাইলে, খালের পানিতে ভাসতে থাকা চাঁদ, গরম রক্তের সাথে মিশে তার মুখগহ্বর গলা অব্দি তেতো করে দিলো। এবং, সম্ভবত জীবনে শেষবারের মতো আবার তার আলতো অভিমান হলো মা’র ওপর - ‘আম্মা, আমি হাছাই মরি যাইরাম। তুমি অখনও আইলায় না...!” (হননপিয়াসী রাত)
এতো সহজ মৃত্যু! এতো সরল তার আগমনের পথটুকু! আমার আবার কেবলই গল্প-কথা মনে পড়ে যায়-“মৃত্যুর গল্পে দীর্ঘ মিছিল।” (ধ্বংসকালীন বোবা গল্প)

অতঃপর ভাবনারা-শব্দেরা-উপলব্ধির অনুভবেরা জড়িয়ে জড়িয়ে যায় সমগ্র সত্তায়। ক্ষুদ্র আমি ততোধিক মূর্খতা নিয়ে ভেতরে বয়ে চলা প্রচণ্ড ভাবাবেগ উগরে দিতে চাই কেবল। লিখতে-লিখতে বকতে-বকতে অহেতুক ছাই-ভষ্মে ভরে যায় একের পর এক সাদা পাতা। প্রতিক্রিয়া কিংবা অভিব্যক্তিটুকুও যেন ধরা দিল না, জীবনের সকল ব্যর্থতা উঁকি-ঝুকি দিয়ে গেলে বোঝা হল একটা কিছু লেখার ছলে আরও কয়েক পাতা ব্যর্থ প্রচেষ্টা জমে গেল চলতি পথে। তবু ঘুরে ফিরে ভ্রমান্ধ দৃশ্যের বায়স্কোপ-এর পাতা ছুঁয়ে দেখা বারকয়েক, আবার পড়া-
“মৃত্যু বড় মুর্খ, তারে জন্ম দিতে দিতে জীবনের বৃদ্ধি পায় দেনা।” (উৎসর্গ পাতায় লেখা জনৈক কবির কবিতা)

আর হ্যাঁ, এমন করে এইভাবে জানা হয় – কোন কোন বইয়ের পাতায় দেখো খুঁজে পাবে তুমি, তোমার আর্তনাদ, তোমার গুমরে ওঠা, তোমার দীর্ঘশ্বাসের সমূহ কারণ কিংবা তোমার গহীনে লুকোনো আততায়ী কান্নার ঢল।





শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০১২

ভ্রান্তিবিলাস কিংবা সোনা-মাছ এর স্মৃতিভ্রম

একঃ
কী বলবো? কী বলবো ভাইজান? দিনের প্যাডেল মারতে মারতে, চালাতে চালাতে নিত্য ভাবনাটা ফুলে-ফেঁপে গল গল গড়াচ্ছে, আগুনের আঁচে য্যান ভাতের ফ্যান!
মিতালী আজও এল, আহারে! ইশ্রে! ফাঁদ ভাইজান, ফাঁদ। জানো, কী যে এক জাল, ছাড়ানো তো দূর, ফাঁক-ফোকর পাচ্ছেই না মেয়েটা – ডানা ঝাপটাবে, হাহ্!

ক’দিন ঘুরতে না ঘুরতেই কোন্ মাছ যেন সব ভুলে-মুছে-চেপে-ঢেকে স্মৃতি ধামাচাপা দেয়? গোল্ড-ফিশ, আহা বাংলায় কী সুন্দর দাঁড়ায় গো শব্দটা সেজে-গুজে, সোনা-মাছ।
‘লক্ষ্মী সোনা, বাপের কাছ থেকে টাকাটা আমায় এনে দাও।’ – কথার ধারে মিতালীর সোনা-সোনা শ্যামরঙা মুখ কেমন চুপসে ফাটা বেলুন। আমরা তো বেলুন-ওড়া দুর্দান্ত কৈশোর দেখেছি ঘোরে-বেঘোরে স্কুল পালিয়ে-কাটিয়ে। সুবর্ণ বেশ পুরুষ-পুরুষ হয়ে উঠছে বুঝি আজকাল?

গাঢ় সন্ধ্যায় আমি মিতালীকে পড়ি, পড়তেই থাকি। মিতালী ছেঁড়া-ফাটা-ছিন্নভিন্ন-ঝাঁঝরাও। মিতালী কাজল ছুঁতে ভয় পায়। সুবর্ণ যে জানে কাজল আর মিতালীর গভীর দু’চোখ কী নিবিষ্ট প্রেমমগ্ন, নেশা-জাগানিয়া!
‘জানিস্ বেশ্যা হয়ে আছি। ও চাইলে আমায় দিতেই হবে। আমি চাইলে ওকে খুঁজেই পাইনে কোথাও।’ – মিতালীর উচ্চারণের ছাপ ওর চোখে ভেসে ওঠে, চোখ যেন বায়স্কোপ, যেন পুঁথি পাঠ চলে কোনো আসরে। আর একের পর এক দৃশ্য দেখে চলা, সুবর্ণ-মিতালীর ঘর-ভাবনা, আমি দর্শক!
মিতালী বিয়ের নেশায় পাগলপারা হয়ে ঠিক ঠিক তিন বছর আগে করেই বসলো বিয়েটা। যদিও অন্য একটা পরিবারের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার বাড়তি ঝামেলা ছাড়া নতুন কিছুর স্বাদ পেল না। একসাথে থাকাথাকিটাতো নতুন নয় ওদের জন্যে। বরঞ্চ সূবর্ণর এই পরিবর্তন ভাঙা ভাঙা বিপন্নতা নিয়ে এল। বউয়ের উপর দাবীটাকে কয়েক গন্ডা বাড়িয়ে বউয়ের হাতখরচ, বউয়ের বাবার বাড়ি-গাড়ি-টাকায় নিজের দাবীর ব্যাপারে বেশ সচেতন হয়ে উঠলো সূবর্ণ।

এবং অতঃপর ঘরটা অ্যাকুরিয়াম হয়ে উঠলে মিতালীকে আমি সোনা-মাছ হতে দেখেছি। ধুলো জুটিয়ে সযতনে ঢেকেছে মিতালী ধল-প্রহরের কান্না।
‘মিতালী’কে ভুলিয়ে বুঝিয়ে পুতুল-পুতুল সাজিয়ে নৈবেদ্যর থালে সন্তর্পণে বসেছে মিতালী – ঠোঁট হেসেছে, চোখ জ্বলেছে যার। তবু সোনা-মাছ ফাঁদ পেরোবার পথে পালায় না। জীবনের তীব্র মাদকতা, টেনে দিয়েছে না পেরোবার সীমানা – চেনা শরীরের ঘ্রাণ! কিন্তু শুধু কী তাই? নির্ভরতা না অপমান। নিজের সিদ্ধান্তকে অন্যের চোখে খাটো হতে দেখার ভয় – অপমান। না কী আশ্রয়! স্কুল-কলেজ-এমবিএ পাশ মিতালীর খুব কি অভাব হতো ভাইজান নিরাপত্তার?

মিতালী তখন একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায় আমাদের সামনে। চা খেতে-খেতে, আড্ডা দিতে-দিতে আমরা ভাবি – ঘর-পালানো, স্কুল-পালানো মিতালী বৃত্ত ভাঙার সাহস পায় না কি করে?
মিতালীকে শুনতে-শুনতে, বুঝতে-বুঝতে আমার কেবল, কেবলই আমার মা-কে বোঝা হয়ে ওঠে ভাইজান।

দুইঃ
মায়ের সত্যি নিজস্ব কোন ঘর ছিল না কখনও। গোধূলি পেরোনো অবকাশে কিছু লিখতে বলা হলে কী ই বা লিখে ওঠা হতো তাঁর। ঠিক-ঠিক সব ঠিক হয়ে এল – ভাবতে থাকার দ্বন্দ্বে ডুবে চল্লিশোর্ধ্ব বৎসরের দিন-পরিক্রমা। কর্তৃত্বের অহম্ বড্ড লোভনীয় এক বস্তু, তাই বাবারও ততদিনে মা-কে চিরে-কেটে-খুঁড়ে দেখা শেষ।

জানো না, তুমি জানো না ভাইজান, মায়ের মাঝেও তরতাজা এক সোনা-মাছ বসত করে চুপিসারে, ভেতরঘরে।
শিল-নোড়ায় ভর্তা পেষা শেষে, টুং-টাং চুড়ি বাজানো হাতে মাখা ভাত খেতে খেতে কী সন্তুষ্ট এক মা-কে দেখি। ঘর গোছাতে থাকা মা, পিঠা বানাতে থাকা মা, জায়নামাজে ঝিম-গ্রস্ত মা। মুহূর্ত-মুহূর্ত, দিন-দিন, স্বেচ্ছাশ্রমে স্মৃতিভ্রষ্ট সোনা-মাছ মা আমার!

ভাইজান, মনে পড়ে ভাইজান, কার্তিকের নিস্তব্ধ দুপুর, স্কুল শেষের ক্লান্তি মেখে কী দারুণ চুপচাপ! আর মা-এর ফোঁপানো যন্ত্রণায় ভেঙে ভেঙে পড়ছে সমগ্র সত্তা। মা-র চাকরী করা, থিয়েটার-মহড়া সব থামাতেই হবে। মায়ের সন্ধ্যা-শেষের আড্ডাটাও বন্ধ। বাবার সে কী কঠিন আদেশ। কী প্রচণ্ড দমবন্ধ অনুভবে কাঁপছি দুজনে – ভয়ে। কী বিপন্ন এক বোধে! আর ভেসে যাচ্ছে ঘর, দুটো মানুষের খোলস সাঁটা সংসারের বিষে। কী বিভ্রান্ত অবগাহনে জেনে নিয়েছিলাম ক’মাস পরপর মার্ মার্ কাট্ কাট্ মুহূর্তদের বেমালুম চেপে-ঢেকে ভুলে বসতে জানে মানুষগুলো।

আজও মনে আছে, কড়া রোদ ডিঙিয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকার খেলায় জিতে যাওয়া আমি তোমার চোখের দিকে তাকানোর স্পর্ধা পেতাম না সেসব দিনে। মনে হতো যেন পুড়িয়ে দিতে চাইছো – প্রতিবেশীদের প্রশ্ন, বুয়ার অহেতুক কৌতূহল, দিদা-দাদুর দুশ্চিন্তা আর, আর আমার প্রচণ্ড ভয়টাকেও। কী গাঢ় স্বরে বলতে – ‘সব মানুষ আর তুই কি তা এ্যাক নি? অতো ডরাইবার কি তা আছে?’

তিনঃ
জানো ভাইজান, গেল বৃহস্পতি, ডুবে গেলাম - ভেসে গেলাম - উড়ে গেলাম আর মরে গিয়েছিলাম একবার। কয়েকটা পাড়া থাকে কি? কিংবা একটা জায়গা, নেশার-মোহের-ভরসার-অভ্যেসের। অঙ্কুর সূর্যাস্তের পর এল সেদিন। আর দু’হাতে মেখে-মেখে দিতে থাকলো সমস্ত চাওয়াগুলোকে, হাতে-গালে-কপালে! অঙ্কুর চাইছে, খুব করে চাইছে – একটা সোনামাছ! যেন ভ্রান্তিবিলাস জমা রেখে রেখে নিজেদের অপরাহ্ণের কাছে বেচে দেবার পালা। অঙ্কুর আর আমি, আমি আর অঙ্কুর – উড়ে বেড়ানো, ঘুরে বেড়ানো, ডানা মেলার খেলা।
তবে পিছ্লে গেলাম বটে! ‘ভুলে যাও, প্লিজ ভুলে যাও’ উড়ে এসে ঠিক ঠিক জুড়ে বসলো আমাদেরও মাঝে। অঙ্কুর খুব করে আমার স্মৃতিবিভ্রম চাইছে আজ। ভুলে যাও অপমান – অসম্মান – নিকৃষ্ট গালিগালাজের দিন, ভুলে যাও শরীরের ক্ষতচিহ্ন যত!
অঙ্কুর আমার ভেতরটা মাড়িয়ে আশ্চর্য এক দম্ভে বাঁচে ইদানীং। এবং আমি কেবলই কৈশোরে ফিরে যাই।

চারঃ
গোধূলি পেরোনো নৈঃশব্দ আঁকড়ে ধরলে ভাবতে শেখার পালা – মা-ও এভাবে ভুলে যেতে যেতেই জড়িয়ে গিয়েছিল বুঝি! ভুলে যেতে যেতেই মায়ের মাঝে আমরা বসত বাঁধি, মায়ের এক জন্মের কী তীব্র আফসোস। পালাবার দ্বারের শেষ কপাট তুলি - এই আমরা!

পাঁচঃ
আজ এতকাল পর তরুণী-সন্ধ্যায় অঙ্কুরের চোখ দুটো কী ভীষণ চেনা-চেনা এক ভয় এনে দেয় ফের! ঠিক যেন রোদ-রোদ বিষণ্ন কার্তিকের দুপুরে অস্তিত্বে ভাঙন। ঠিক যেন অসহ্য সেই ডুকরে ওঠা! অনেক দিনের ধুলো মুছে চেনা বিষের কী অদ্ভুত অনুভব।
দিনশেষে আবার আমার মিতালীকে মনে পড়ে, মা-কে মনে পড়ে খুব আর মনে হতে থাকে –
‘অতো ডরাইবার কি তা আছে? সব মানুষ আর তুই কি তা এ্যাক নি?’……
তখন নিষ্পলকে দেখি ঘরের কোণে এ্যাকুরিয়ামে গোল্ড-ফিশটা ঘুরে ঘুরে একই জায়গায় ঘুরপাক খায় কেবল।






মঙ্গলবার, ২২ নভেম্বর, ২০১১

৮ অগ্রহায়ণ ১৪১৮

চোখের সামনেঃ
২০৪
২০৩
২০২
ব্লাড ব্যাংক
প্যাথলজি ....
আর

টুকরো রোদ্দুর মুক্ত!

চোখের সামনেঃ
ফিনাইল
ডেটল
ব্যান্ডেজ
হতাশ মানুষ
বন্দী ...
আর

আহত চড়ুই মুক্ত!






বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০১১

কফিনের সংসার

দুটো কফিনের বাক্স কয়েকটা সংসার এর সরঞ্জামাদিতে ভরপুর। কফিন দুটোতে যারা এসেছিল তাদের অস্থি-মজ্জা এতোদিনে গোরস্থানের মাটি কিছুটা উর্বর করেছে। মৃতজীবী, ক্ষুধার্ত পোকা-মাকড়ের অন্ন যুগিয়েছে ওদের দেহ। শুধু কফিন দুটো বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে শুকিয়ে বহাল তবিয়তে ঠায় দাঁড়িয়ে ফুটপাতের অর্ধেক জায়গাজুড়ে।

অনায়াসে মৃত শরীরের বাহনের ভেতর জীয়ন্ত মানুষগুলোর যাবতীয় সংসারের ঠাঁই মিলেছে। ফুটপাতে গজিয়ে ওঠা ভরন্ত সংসার। একটা-দুটো নয়, চার-পাঁচ ঘর সংসার ঢুকে গেছে দুটো কফিনের ভেতর। ভরপুর সংসারের উপজীব্য কাঠের কফিন। একটার উপর আরেকটি তুলে রাখা, একটুখানি ফাঁক ডানপাশে। উপরেরটি থেকে সময়মত বের করা হয় হাড়ি-পাতিল-গ্লাস। নীচেরটায় বিছানা-বালিশ, কাপড়-চোপড়।
আসমা ইট আর লাকড়ির চুলো সাজায়। চুলো সাজায় রুকি, ডালিয়া, মইন্যার মাও। পথচারীর পথ আর থাকে কই। তবে অসুবিধা খুব একটা হয় না। গোরস্থানের দেয়াল লাগোয়া এই সংসারগুলোর সাথে বেশ ভাব দারোয়ান আর কর্তৃপক্ষের। প্রতি শুক্রবার কবর জিয়ারত, দোয়া, মিলাদ, দান-খয়রাত এর বদৌলতে মোটাসোটা আয় হয় এদের। শবেবরাত-শবেকদর-রমজান-ঈদ এর কথা বলাই বাহুল্য। দারোয়ান- গোর খোদক - ড্রাইভার- রক্ষণাবেক্ষণের কর্মী- ঝাড়ুদার - এদের ওদের সাথে ভাগ-বাটোয়ারা করে, দিয়ে-নিয়ে, লাভে-লোকসানে ভালো বৈ মন্দ নয় আয়-রোজগার।
আসমার দিন আমোদেই কাটে। কবে কোন্ আশ্বিনে মুখে স্তন গুঁজে মা এই শহরে নিয়ে এসেছিলো সে বৃত্তান্ত মার মুখেই শোনা। এ শহরের অলি - গলি, ঘুপচি আন্ধার আর ঝলসানো পথে তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। এখন ষোড়শী কন্যার সংসারে একজন অন্ধ সঙ্গী আর কোলজুড়ে আটখানা ছা। অন্ধকে সবাই বুড়া ডাকে। জন্মের পর বুড়ার নাম কি ছিল, কিংবা আদৌ কোন নাম মা-বাবার কাছ থেকে বুড়া পেয়েছিল কিনা তা আসমারও জানা নেই। তিনজন ঘরণীকে কোন্ কোন্ পথের বাঁকে যেন রেখে এসে এখন এই আসমার সাথে ঘর করছে বুড়া। দিন-রাত্রি লাঠি ধরে পথে বসে দু’এক পয়সা কামাই করে, বলা চলে আসমার ঘাড়ে চেপেই পথ চলে। আসমা টাকা আনে কিংবা কোন না কোনভাবে খাবার যোগাড় করে। ষোড়শীর শরীরে ছল ছল নারীত্ব, বুড়া অনেককিছুই জেনেও দেখে না বটে। অন্ধত্ব তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

মইন্যার মা’র কষ্টের দিন শুধু ঘুচে না। মা-বেটা দু’টা মাত্র মানুষ, হোটেলের উচ্ছিষ্টে ভরপেট খেয়েও বলে ফিরে - “আহারে! মোর জমিন, উডান, ঘর সব তলায়া গ্যালো। হায়রে রাক্ষুইসী নদী। কই পামু এমুন ঘর-গেরস্থালী। আফনে কই গ্যালেন মইন্যার বাপ।" দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডুকরে কেঁদে উঠলে পাঁচ বছরের মইন কোন এক অজানা ভয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে।
খানিক দূরে সবজির ঠেলা নিয়ে বসে থাকে শামসু আর চায়ের অস্থায়ী টঙটাকে প্রায় স্থায়ী করে ক’দিন থেকে চা-বিস্কুট-কলা-সিগারেট-পান নিয়ে পসরা সাজিয়েছে গণেশ। বিদ্যুতের খুঁটি দুটোয় রশি বেঁধে কিংবা কবরস্থানের গ্রিলে বেশ শুকোচ্ছে ওদের ভেজা শাড়ি, ব্লাউজ, বাচ্চার কাঁথা, প্যান্ট, টুকরো ত্যানা। ফুটপাথের ধারে এসে মিলেমিশে একাকার ঘর- গেরস্থালী- রাজপথের চাঞ্চল্য কিংবা দিনযাপন।
মৃত্যুর শীতলতা চোখে- মুখে মেখে আল-আমিন গোলাপজল-কাফনের কাপড়-আগরবাতি সাজানো ‘শেষ বিদায়’ স্টলে বসে থাকে। বারোমাস সাদা টুপি মাথায় হাসি-কান্নার নিপুণ অভিনয় করে চলে।
বাচ্চাগুলো খেলে বেড়ায় - হেসে কাটায় অহর্নিশ দিন-রাত্রিগুলো। কত কত কাফনমোড়া লাশ আসে নিত্য, কয়েক মুহূর্ত পর পরই। খেলা ফেলে দৌঁড়ে যায় পাঁচ বছরের মইন, দশ বছরের মিতালী, আট বছরের শ্যামা, রুকসানা, চৌদ্দ বছরের কলিম আরও গুটিকতক পাঁচ-তিন-নয়-দশ-বারো-চৌদ্দ বোঝাই দল। তিন বছরের আয়শাটাও ইদানীং এগোয় গুটি গুটি পায়ে। বড়রাও এগোয় তারপর ধীরে ধীরে। মৃত্যু এখানে উৎসব, মৃত্যু এখানে পাঁচ-দশ-বিশ-পঞ্চাশ টাকা পেয়ে চকোলেট-চুইংগাম-ঝালমুড়ি-লজেন্স কিনে খাওয়া। মৃত্যু এখানে জীবনধারণের অন্যতম পন্থা।
আঞ্জুমান মুফিদুলের লাশবোঝাই গাড়ি মানেই তাই চরম বিরক্তি। বেওয়ারিশের দোয়ায় কেউ অর্থ ঢালেনা। বেওয়ারিশ লাশের ভাগ্যে ভ্রু-কুটি ছাড়া কিছুই জোটেনা।

এভাবে দিন কেটে যাওয়ার কথা। এভাবেই দিন কেটে যাবে। তাই এর বেশি কিছু ভাবতে পারেনা মানুষগুলো কিংবা ভাবনাকে অন্য কোথাও ঠাঁই দেয়ার ইচ্ছাই নেই ওদের। আসমা তাই রুটি-তরকারি মেলে ধরে আটটা আন্ডা-বাচ্চাসহ সকালের নাস্তা খেতে বসে পড়ে। বুড়ো হোটেলের দয়ায় চা খেয়ে বিড়ি ধার করে গণেশের কাছে। রুকিকে আজকাল আল-আমিনের সাথে কোথায় কোথায় যেন উধাও হতে দেখা যায় সন্ধ্যার আঁধারে। শামসু মাঝে মাঝে মইন্যার মাকে নিজ থেকেই দিয়ে যায় কপিটা, বেগুনটা, শাকের গুচ্ছাটাও। আর গণেশ জমানো টাকা থেকে এক হাজারে একটা মোবাইল কিনে নিল কয়েক বছর পুরোনো এক সাধ মেটাতে।

নিত্যদিনের মতো সূর্য-চাঁদের আলো-আঁধারি খেলার পরে রাত নেমে আসে। কবরের উপরে আলো ছড়ায় সরকারী বাতিগুলো। কফিনের পাশে সারি সারি পলিথিন-তাবুর আড়ালে যাযাবর সংসারগুলো দিব্যি সুখনিদ্রায় ঢলে পড়ে। কিন্তু হঠাৎই প্রচন্ড হট্টগোলে চমকে ওঠে রাত। বুড়ার কর্কশ আর্তনাদে কোন এক শিশু ঘুমভাঙা কন্ঠে কেঁদে ওঠে। বুড়ার মাথা ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে অন্ধ দু’চোখ বেয়ে। আকুলভাবে তবু কয়েকটা টাকা জড়িয়ে আছে বুড়া। কফিন দুটো উল্টে পড়ে আছে বেওয়ারিশ হয়ে। চার-পাঁচটি সংসার এখানে-ওখানে ছড়িয়ে লন্ড-ভন্ড হয়ে গড়াগড়ি খায় রাস্তায়। লাঠির নির্যাতনে পলিথিনের সম্ভ্রম খুলে নগ্ন হয় সাংসারিক নিদ্রা। ফুটপাত-দখলমুক্তকরণ কমিটির কর্মীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এ রাস্তা- সে রাস্তা, এ ফুটপাত-সে ফুটপাত ঘুরে ঘুরে রাতশেষে এখানে পৌঁছে।
সিটি-কর্পোরেশনের গাড়ি বোঝাই হয়ে অনেক জিনিস অদৃশ্য হয়ে যায়। ততক্ষণে মাটির হাড়ি-পাতিল ভেঙে চৌচির, ভয়ার্ত শিশুদের ক্রন্দন শ্রান্ত ফোঁপানীতে সীমাবদ্ধ। আর বুড়ার মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে মানুষ আজকাল বড্ড বেশি বাতাস টেনে নিচ্ছে নি:শ্বাসের সাথে। বাতাসের অনেক অভাব বোধ হয় পৃথিবীতে.....

সকালের আলো ফুটলে কফিনের বাক্স দুটোকে কোথাও দেখা যায়না। শুধু বুড়ার লাশটার জন্য কাফনের কাপড় ফ্রিতে দিয়ে দেয় আল-আমিন। একেবারে ছোটটিকে নিয়ে আসমা সেই সাত-সকাল থেকে কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেছে। সাতটি ওয়ারিশ নাকের সর্দি - চোখের জল মিশিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ালেও বুড়ার লাশ দাফনে কেউ অর্থ ঢালেনা। তাই বেওয়ারিশের সমতুল্য দোয়া-দুরূদটুকুই জোটে লাশের ফেটে যাওয়া কপালে।





বুধবার, ৩০ মার্চ, ২০১১

মেঘগুলো সব ভারমুক্ত বাষ্প অভিলাষে

ঝুম ঝুম কিংবা ঝর ঝর ঝর। কখনও টিপ্‌ টিপ্‌ টিপ্‌। জলের শব্দ। জল ঝরার শব্দ এক আবেশে জড়ায় আমায়। চিরকাল। ভালোলাগার স্পর্শে হঠাৎ হারাই... নিজের মাঝে... গহীন আমিতে। রাস্তা ধীরে ধীরে ভিজছে। জল ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি নাম এ নামছে। হাঁটতে হাঁটতে ছোট্ট জল ফোঁটা বড় বড় হয়ে নামে আর তারপরেই – মেঘগুলো সব ভারমুক্ত বাষ্প অভিলাষে।

প্রজাপতিরঙ মন উন্মত্ত, উন্মনা। অজানা ভালোলাগা। রাস্তায় খানা-খন্দ, এ শহরের ভাঙা পথে প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা। এক যুবতী স্নিগ্ধতাকে দুমড়ে মুচড়ে বুড়ো-বুড়ো বিরক্তিতে ভরপুর। নীলক্ষেত বইয়ের দোকানের সামনে যেন মরণ-ফাঁদ। এতো বড় গর্ত! হাঁটার জায়গাটুকোয় বিরক্তি-বীভৎসতা-কটুক্তিসহ নিরস মানুষেরা। অথচ কী অদ্ভুতভাবে কাদা পায়ে জড়ানো মূহুর্তে দারুণ স্নিগ্ধতায় ডুবে যাই আজ।

অলি-গলি তখন থকথকে কাদা আর পানি সর্বস্ব। থপথপ পায়ে হাঁটা সুন্দরবন ক্যুরিয়ার সার্ভিস – নীলক্ষেতের ঘুপচি কোণে। সখীসমীপেষু – চিঠি পৌঁছে যাবে ঠিক। মানুষ দেখার খেলাটুকু বরাবরই বেশ উপভোগ্য। খাম হাতে পাঁচ-ছ’জন। একজন সবার শেষে এসেও আগে পোস্ট করতে চাওয়ায় কথার উপর কথা, কথা দিয়ে কথা কাটা। কী ব্যস্ততা, কী তাড়া সবার।

আমি শুধু খামগুলো দেখি। গুটি গুটি হাতের লেখা, কোনটায় লেখাগুলো বড্ড এলোমেলো। কিছু হয়তো পৌঁছে যাবে কাঠখোট্টা কোন অফিসে-দফতরে। কিছু চিঠিতে বোধহয় মন আলপনা এঁকেছে। এমন অন্য কোন বৃষ্টিভেজা দিনে কেউ হয়তো আনমনে খুলে নেবে খয়েরী-হলুদ খাম।

ঘরে ফেরার তেমন তাড়া কোনকালেই থাকেনি তেমন, তবুতো ঘরেই ফেরা। স্নাঙ্ঘরে স্বয়ম্ভরের সুর। থেকে থেকে মনে অদ্ভুত গুণগুণ। দোল দোল, দোল খায় প্রিয় শিহরণ!

জানালার ওপারে মেঘ মেঘ ধোঁয়াশা। বটগাছের ওপ্র নিকষ আঁধার। ঘোর লাগা মনে ঔদাসীন্য ভর করে। আমাদের মানুষেরা বেঁচে-বর্তে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে ওঠে। আমাদের মানুষেরা আকাশের রঙ দেখতে ভুলে যায়। শুধু শূন্যতাই দেখে। আমাদের মানুষেরা বুড়িয়ে যেতে এতো ভালোবাসে ??

বৃষ্টি তবু এ শহরেও আসে। নোংরা ভাঙা শহরের বাসস্টপে, অলি=গলিতে, কলেজে-স্কুলে-ভার্সিটিতে। বৃষ্টি আসে চাচীর চায়ের ঠেলাতে, যে ঠেলার পাশে অস্থির ছেলে-মেয়ের আড্ডা বসে। বৃষ্টি আসে পথের ধারের ভাপা পিঠার উনুনের ওপর। মামা চটজলদি পিঠা উঠোয়, উনুন নেভোয়। বৃষ্টির ফোঁটা পড়তেই পথের ধারে হামাগুড়ি দেয়া উলঙ্গ শিশু ফিক করে হেসে ওঠে। ব্যবসা গুটোতে গুটোতে আয়না-চিরুণী-হাতঘড়ি বিক্রেতা বলেন- “আহ্! জব্বর বৃষ্টি আইবোরে!”
ক্ষতির যন্ত্রণাকে কষ্টকে প্রকৃতি গ্রাস করে কত সহজেই।

মেঘ খন্ড খন্ড দামাল উদ্দামতায় আকাশের একোণ থেকে ওকোণ দাপড়ে বেড়ায়। পাগল করা বাতাস ছুঁয়ে যায় সমস্তটুকু। হয়তো কিছু মানুষ ধুপ ধাপ জানালা লাগায়। কেবল কয়েকজন জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে মাতাল থেকে তীব্র মাতাল হয় ক্রমশ…





সোমবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০১১

নৈর্ব্যক্তিক বেদনা পুষেও গান গেয়ে হেঁটেছি তোদের শহরে

এক পা, দু পা করে পিছিয়ে যাও ঘন অন্ধকারে। একদিন … দু’দিন … তিন দিন… তারপর একদিন গভীর চোখে তাকাও ধূসর পর্দার ওপাশে। দেখবে চার, তিন, দুই, এক কিংবা শূণ্য … ! শ’চারেকের মধ্যে এইতো এ ক’জন একটা নাম তোলে রাখবে অতীতগন্ধী তোরঙ্গে ।

“ আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ!
সচ্চরিত্র ফুল আমি যত বাগানের মোড়ে লিখতে যাই, দেখি
আমার কলম খুলে পড়ে যায় বিষ পিঁপড়ে, বিষের পুতুল!”
– (আবুল হাসান)

কোন কোন কবিতার ঘ্রাণ নিয়ে দেখো, ঠিক যেন তোমার যন্ত্রণাটা গুমরে উঠছে উচ্চারণে। তোমায় ফিরতে হবে অতঃপর। ক্লান্ত - শ্রান্ত - ক্লিশিত - ভঙ্গুর তুমি, কুৎসিত কাকটার চেয়েও অধম তখন। তোমার তো ডানাটুকু নেই, ডাস্টবিনের মতোন কোন অবলম্বন নেই। এমনকি আবর্জনার মতোন কোন নির্ভরযোগ্য পুঁজিও নেই তোমার তখন।

“ কেউ বা ফিসফিস করে বলেছেন, সত্যি
সম্ভাবনা ছিলো! কেবল আমি জেনে গেছি লোবানের ঘ্রাণে আসলে পরাজিত মৃত্যুর
কথাই লেখা থাকে!”
– (সুমন সুপান্থ)

পরাজিত নাম আর কার প্রয়োজন?! আর কি কি চাও বলো তো? অনেক প্রাপ্তির চাহিদা তখন নগরের নিস্তব্ধ দুপুরের নিঃসঙ্গতাকে চিরে, কেটে, গুঁড়িয়ে দেবে অসহ্য অপমানে।
পুনরায় তুমি নিশ্চিত থেকো, তবু, তোমার কবিতাই মনে পড়বে –

“অনেকদিন দেখা হবে না
তারপর একদিন দেখা হবে।
দু’জনেই দু’জনকে বলবো,
‘অনেকদিন দেখা হয়নি’।
এইভাবে যাবে দিনের পর দিন
বৎসরের পর বৎসর।
তারপর একদিন হয়ত জানা যাবে
বা হয়ত জানা যাবে না,
যে
তোমার সঙ্গে আমার
অথবা
আমার সঙ্গে তোমার
আর দেখা হবে না।”
– (তারাপদ রায়)

অতএব ফের একটা ঘুড়ি কাটা পড়লো দেখে, অহেতুক মন কেমনের অপরাহ্ণে অর্থহীন ভাবালুতায় কলম পিষে যাবে। তখন অযথাই কিছু কথা কিংবা ঘটনার দোলাচলে অনেক কথা উঁকি দিলে গোটাকতক বিকেল কাউকে না কাউকে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছে করবে।
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------

* শিরোনাম ভাইয়ার (সুমন সুপান্থ) "সওয়াল" কবিতাটি থেকে ধার করেছি





মঙ্গলবার, ৪ জানুয়ারী, ২০১১

শীত-শীত রাতেরাও পোষা সারমেয়

অবাঞ্চিত হতে হতেই চরম স্পর্ধা জাগে -
তোকে ইদানীং আর ছুঁয়ে দেখিনা অন্তত।
শীত - শীত রাতেরাও পোষা সারমেয় বেশ,
তোকে ইদানীং আর মনে ধরেনা বিগত।

আমার প্রপিতামহ -
রাত রাত গন্ধ মেখে, গ্রাম-নদী-গঞ্জ-ঘাট,
পেরিয়ে-জাগিয়ে-উড়িয়ে, হাঁটা পথ - ঘুর পথ বেয়ে -
কত নারী - কত ভিটে - সে কত রূপোলী গল্প!

আমার প্রপিতামহী-
মহুয়ার নেশাগন্ধী ব্যাকুল অতৃপ্ত রাত্রি।
জংলার ধার ঘেঁষা বেড়া ভাঙা নড়বড়ে ঘর।
অনুভবে খন্ড-বিখন্ড বোধ আর
পাপ - পাপ শঙ্কা পরেও তীব্র সুখ ছুঁয়েছেন -
নিয়ত।

যন্ত্রণা উগরোতে গিয়ে জেনেছি -
বিষ - বিষ জ্বালায় সর্বাঙ্গ কুঁকড়ে যায় ক্রমশ।
ব্যর্থতা চেপে এলে কন্ঠনালীতে কী ঘন মেঘ জমে!

প্রশ্নের চোখ লাল-লাল, তপ্ত নিঃশ্বাস-
ছিঁড়ে-খুঁড়ে-ফুঁড়ে খাওয়ার আগ্রাসী চেহারা ফোটে।

অতঃপর -
হে সুহৃদ, প্রিয় পাঠক, নাম অজানা সম্পর্কের জন-
স্বপ্ন আবাদ করেও , আমি এক তুচ্ছ অধীশ্বর।

৩০/১১/২০১০